জনপ্রিয়
সাহিত্যিক ‘শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়’ এর উপন্যাস ‘গয়নার বাক্স’ ও ছোট গল্প
‘রাশমনীর সোনাদানা’ অবলম্বনে স্বনামধন্য অভিনেত্রী ও নির্মাতা ‘অপর্না সেন’
২০১৩ সালে নির্মাণ করেন ‘গয়নার বাক্স’ মুভিটি। ‘অপর্না সেন’ উপন্যাসটা
পড়েছিলেন ১৯৯৩ সালে, তখনি তিনি সেটিকে নিয়ে মুভি নির্মাণ করতে চেয়েছিলেন,
কিন্তু তখন বাজেটের স্বল্পতা ও কারিগরি সমস্যার কারণে তার এই ড্রিম
প্রজেন্ট সফল হয়ে ওঠেনি। অবশেষে ২০১৩ সালে এসে ‘অপর্না সেন’ তৈরী করলেন তার
সাধের ‘গয়নার বাক্স’।এ মুভির গল্পের উৎপত্তি ভারত পাকিস্তান দেশ ভাগের
অনেক আগে থেকে শুরু হলেও, মূল গল্প শুরু হয় দেশ ভাগের দুই বছর পর ১৯৪৯
সালে। এক জমিদার বাড়ীতে বউ হয়ে পা রাখে ‘সোমলতা’। সেই বাড়ীর নিয়ম অনুযায়ী
নতুন বউ আশীর্বাদ করতে যায় বাড়ীর সবার বড় গুরুজন পিসিমাকে যিনি ১২ বছর বয়সে
বিধবা হয়ে এই ভাইয়ের সংসারে আছেন। পিসিমার সম্বল বলতে একটা গয়নার বাক্স যা
সব রকমের সোনার গয়নায় ভর্তি।
ডাউনলোড করুনঃ
সুত্রঃ Friendsblog
এই
গয়নার বাক্সের প্রতি সংসারের প্রতিটি সদস্যের লোভ। কখন বুড়ি মরবে আর তখন
সেই বাক্স হাত করা যাবে। অতঃপর একদিন পিসিমা ঠিকই মারা গেলেন কিন্তু ফিরে
এলেন ভুত হয়ে আর দ্বায়িত্ব দিলেন সহজ সরল নতুন বউ ‘সোমলতা’কে বাক্স লুকিয়ে
ফেলার, যেন এটা কেউ হাত করতে না পারে। অতঃপর শুরু হয় ‘সোমলতা’ ও ভুত
পিসিমার নানান রকম কান্ড-কির্তীর যা আপনাকে হাসাবে, ভাবাবে এমনকি কাঁদাবেও।
অবশেষে গল্পে ১৯৪৭ সালের দেশ ভাগের পটভুমী থেকে উঠে আসে ১৯৭১ সালের আমাদের
মুক্তিযুদ্ধ…এ মুভির গল্পটা খুব সহজ সরল ও মজার। কিন্তু এ গল্পের ভিতর
দিযেই তৎকালীন কঠোর হিন্দু সমাজ ব্যবস্থার এক নির্মম রূপ আমরা দেখতে পাই। এ
যেন রবীন্দ্রনাথের ‘হৈমন্তী’ এর এক বাস্তব রুপ। দেশ ভাগের আগের চিত্রে
আমরা দেখতে পাই বাল্যবিবাহ, যেখানে মেয়েদের পুতুল খেলার বয়স সেখানে ১১ বছর
বয়সেই তাদের বিয়ে দিয়ে দেয়া হয় তাদেরই তিন গুন বয়স্ক কোন লোকের সাথে। অনেক
সাধ-আল্লাদ ও ঘর সংসার করার স্বপ্ন নিয়ে যখন মেয়েটি শ্বশুর বাড়ীতে পা রাখে,
তার এক বছরের মাথায় বৃদ্ধ স্বামীর আকস্মিক মৃত্যুর সাথে সাথে মৃত্যু ঘটে
মেয়েটির সকল স্বপ্নেরও।
যখন তার ভালবাসার সময়, স্বামীকে নিয়ে নানান রকম সুখ কল্পনায় বিভোর সে তখনই
তার গায়ে ওঠে বিধবার সাদা শাড়ী, তার শরীর থেকে গহনা খুলে নেয়া হয়, তার
সুন্দর লম্বা চুল কেটে ফেলা হয় আর তার সারা জীবনের জন্য খাদ্য হয়ে যায় ভাত ও
কাঁচকলা সিদ্ধ। মাছ, মাংস সব কিছু হয়ে যায় হারাম। বাপের বাড়ীতে এক বোঝা
হয়ে জিন্দালাশের মত বাকি জীবনটা কাটাতে হয় তাকে। তখন ছিল জমিদারদের যুগ।
দেশ ভাগের পর আর সেই জমিদারী থাকে না। অনেক জমিদারকে তাদের ভিটা-মাটি ও জমি
ছেড়ে দেশ ছাড়তে হয়। ভাই এর সাথে ভাইয়ের সম্পত্তি ও বাড়ীর দখল নিয়ে মামলা
শুরু হয়। ৫১ বর্তী পরিবার ভেঙ্গে যেতে থাকে। মামলার টাকা যোগান দিতে ঘরের
অবশিষ্ট ঐতিহ্যবাহী আসবাবপত্র একে একে বিক্রি করে দিতে হয়। এটা নাকি বংশের
রীতি যে জমিদার বাড়ীর ছেলেরা কোন কাজ কর্ম করে না। ব্যবসা করা বা কোন কাজ
করা নাকি তাদের বংশ ও ঐতিহ্যের মুখে চুনকালি দেবার সমান। তবুও যদি কেউ এই
রীতি ভেঙ্গে নিজে কিছু করার চেষ্টা করে তবে পরিবারের অন্যেরা কিভাবে তাকে
টেনে নিচে নামাবে সেই পরিকল্পনায় বিভোর থাকে। কাজ করার বদলে জমিদার
পুরুষেরা শুধুই মেতে থাকে মদ, জুয়া ও মেয়ে মানুষ নিয়ে, এমনকি ঘরে তাদের
প্রেমময়ী স্ত্রী থাকা সত্তেও। এটাও যেন তাদের বংশের একটা রীতি যা মেনে নিয়ে
তাদের ঘরের বউয়েরা শুধুই নিরবে চোখের পানি ফেলে। অথচ, যদি এই একই ভুল
তাদের ঘরের কোন মেয়ে মানুষে করে তবে তাদের উপর নেমে আসে অমানুষিক অত্যাচার।
এখানে মেয়েরা শুধুই ভোগের বস্তু। তাদের অধিকার গুলো সব সময় হরণ করা হয়। এ
সমাজে পরকীয়া যেন একটা স্বাভাবিক বিষয়। স্বামীর কাছে নিগৃহিত হয়ে ঘরের বউ
যখন বাহিরের কারো কাছে প্রকৃত ভালবাসা খুঁজে পায় তখন তাদের বিবেক অনেক সময়
কাজ করে না, কোনটা ঠিক আর কোনটা ভুল। আর যদি কেউ বিবেক ও স্বামীর ভালবাসার
কাছে বাধা পড়ে ফিরে আসে তবে সেই বাহিরের প্রেমিক পুরুষটি এক অতৃপ্ত কষ্ট
নিয়ে শুধু তার ভালবাসার মানুষটির জন্য অপেক্ষা করেই সারা জীবন উৎসর্গ করে
দেয় কিংবা সে কষ্ট সইতে না পেরে নিজের হাতেই শেষ করে দেয় নিজের জীবন…’গয়নার
বাক্স’ মুভিতে তৎকালীন ভারতের সমাজ ব্যবস্থার এই সব নির্মম দিক গুলোই
হাস্য রসের দ্বারা উপস্থাপিত হয়েছে। মুভির প্রথম অর্ধেকের পটভূমী ছিল দেশ
ভাগের পরবর্তী ভারত ও পরের অর্ধেকে ছিল ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পটভুমী।
আমি অবাক হয়েছি যখন মুভির গল্প অপ্রত্যাশিত ভাবে মোড় নিয়ে ১৯৭১ সালে প্রবেশ
করলো। তখন আর মুভিতে কোন হাস্য-রস ছিল না, বরং ছিল মুক্তিযুদ্ধের টান টান
উত্তেজনা ও নির্মমতা। কিছুক্ষণের জন্য আমি ভুলেই গিয়েছিলাম যে আমি ইন্ডিয়ান
কোন মুভি দেখছি। মুভির এ অংশে ‘অপর্না সেন’ অত্যান্ত নিখুত ভাবে
স্বাধীনতার পটভুমী সাজিয়েছেন যা আমাদের দেশের কোন মুক্তিযুদ্ধ ভিত্তিক মুভি
থেকে কোন অংশে কম যায়নি। মুক্তিযুদ্ধের সময় শুধু বাংলাদেশেরই নয় বরং ওপার
বাংলার ছাত্র সমাজও যে মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সর্বাত্বক ভাবে লড়াই করেছিল
সেটাই খুব সুন্দর করে ফুটে উঠেছে এই মুভিতে। ‘গুন্ডে’ ও ‘চিনড্রেন অফ ওয়ার’
মুভির মত এমন কোন আপত্তিকর কিছুই ছিল না এ মুভিতে যা আমাদের স্বাধীনতার
চেতনায় আঘাত হানতে পারে। বিশেষ করে এ মুভিতে আমাদের জাতীয় সংগীত ‘আমার
সোনার বাংলা’ গান ও ‘জীবনানন্দ দাশ’ এর ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতার অসাধারণ
ব্যবহার দেখে আমি সত্যিই আবেগী হয়ে পড়েছিলাম। আমাদের জাতীয় সংগীতের এমন
ব্যবহার এর আগে একমাত্র ‘জহীর রায়হান’ পরিচালিত ‘জীবন থেকে নেয়া’ মুভিতে
দেখেছিলাম (প্রথম মুভি যেখানে ‘আমার সোনার বাংলা’ গাওয়া হয়েছিল)। এ ছাড়াও
মুভিতে এক মুক্তিযোদ্ধার বিনা চিকিৎসায় মৃত্যু ও তার কবর দেয়ার দৃশ্য
সত্যিই চোখে পানি এনে দেয়। সব মিলিয়ে আমাদের দেশে মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে মুভি
যেখানে নিখুত ভাবে খুব কম তৈরী হয়, সেখানে ‘অপর্না সেন’ পরিচালিত ‘গয়নার
বাক্স’ এর অল্প সময়ের নিখুত মুক্তিযুদ্ধের পটভুমী আমাদের দেশের নির্মাতাদের
কাছে একটা চ্যালেঞ্জ স্বরুপ।অভিনয়ের কথা যদি বলতেই হয় তবে সবার আগে যিনি
আসবেন তিনি হলেন ভুত পিসিমা চরিত্রে ‘মৌসুমী চ্যাটার্জী’। এ মুভিতে অভিনয়
করে তিনি বেস্ট সাপোর্টিং রোলের জন্য ফিল্মফেয়ার অ্যাওয়ার্ড পান। আর তার
পরেই যিনি আসবেন তিনি হলেন ‘সোমলতা’ চরিত্রে ‘কঙ্গনা সেন শর্মা’।
এই
অভিনেত্রীকে নিয়ে কিছু বলতে গেলে আসলে খুব কম বলা হয়ে যাবে। শুধু একটা
কথাই বলি, এই মুভিতে অভিনয় করে তিনি বেস্ট অ্যাক্টর ফিমেল রোলে ফিল্মফেয়ার
অ্যাওয়ার্ড পান। এ ছাড়াও ‘শ্বাশত চ্যাটার্জী’, ‘পরাণ বন্দোপাধ্যায়’ ও
‘শ্রাবন্তী’ এর অভিনয় খুবই ভাল ছিল। ‘শ্রাবন্তী’র এটাই প্রথম বানিজ্যিক
মুভির বাহিরে করা মুভি। ‘চৈতী’ চরিত্রে ‘শ্রাবন্তী’ এর স্থানে আর কাউকেই
মানাতো না। আর বিশেষ করে এ মুভিতে ‘শ্রাবন্তী’র গুন গুন করে ‘আমার সোনার
বাংলা’ গাওয়া ও ‘আবার আসিব ফিরে’ কবিতা খুব ভাল লেগেছে।সব থেকে
গুরুত্বপুর্ণ যেটা সেটা হল এ মুভির এনডিং। একই সাথে মুক্তিযুদ্ধের পরিনতি,
ভুত পিসিমার বিদায় ও সেই সাথে এক অতৃপ্ত প্রেমিকের ভালবাসার আকুতি দিয়ে শেষ
করা এ মুভির এন্ডিং যেন রবীন্দ্রনাথের ছোট গল্পের মত। শেষ হইয়াও হইলো না
শেষ। আরো কিছু যেন বাকি রয়ে যায়, আরো কিছু দেখার জন্য যেন মন ব্যাকুল হয়ে
ওঠে। আর সব শেষে ‘রুপংকর’ এর গলায় ‘নদীর ওপারে ঘন কুয়াশা’ গানটি যেন নিয়ে
যায় অন্য এক ঘোর লাগা দুনিয়ায়, যে ঘোর মূভী শেষ হবার পরেও রয়ে যায়
অনেকক্ষণ। তবে এ সব কিছুর পরেও ১৯৪৭ সালের আগে থেকে ১৯৭১, এই দীর্ঘ সময়ের
ইতিহাসের সাক্ষী সেই গয়নার বাক্সের অবশেষে এক সফল পরিনতি দেখে সত্যিই
‘শীর্ষেন্দু মুখোপাধ্যায়’ এর প্রতি শ্রদ্ধায় মন ভরে ওঠে। আর সেই সাথে
ধন্যবাদ জানাতে মন চায় ‘অপর্না সেন’কে এত সুন্দর বাস্তবমুখী একটি উপন্যাসকে
চলচ্চিত্রে রুপদানের জন্য…
সুত্রঃ Friendsblog

0 comments:
Post a Comment